ভাববাদী দর্শন ও ডায়ালেকটিক
আঠারো শতকে বস্তুবাদের পরে জার্মানিতে জন্ম লইল ভাববাদ ইহাকে সাধারণত বলা হয় স্পেকুলেটিভ ফিলসফি। হেগেল এই দর্শনের জন্মদাতা। বস্তুবাদী অপেক্ষা ভাববাদীদের বিচার পদ্ধতি উন্নততর ছিল। বস্তুবাদীরা সকল বস্তুকেই মনে করিত অপরিবর্তনীয়। এই শ্রেণীর দার্শনিকেরা বস্তুর পরিবর্তনকে স্বীকার না করিয়াই তত্ত্ব-নির্মাণ করিত। কিন্তু যে ভাববাদের কথা আমরা উল্লেখ করিলাম তাহা বস্তু এবং তথ্যকে বিচার করিল অন্যদৃষ্টিতে। ভাববাদীরা তাহাদের বিচারে লক্ষ্য রাখিত বস্তুর উদ্ভব, বিকাশ এবং বিনাশের দিকে। বস্তুবাদী দার্শনিকেরা সকল জিনিসকেই ভাবিত অজড়, অনড়, সকল জিনিসেরই যে রূপান্তরের সম্ভাবনা থাকিতে পারে তাহা ইহারা বুঝিয়া উঠিতে পারি না। বস্তুবাদীদের এই দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিচাররীতি সম্পূর্ণভাবে পরিহার করিলেন ঊনবিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ ভাববাদী দার্শনিকেরা সকল জিনিসকেই ভাবিত অজড়, অনড়, সকল জিনিসেরই যে রূপান্তরের সম্ভাবনা থাকিতে পারে তাহা ইহারা বুঝিয়া উঠিতে পারিত না। বস্তুবাদীদের এই দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিচাররীতি সম্পূর্ণভাবে পরিহার করলেন ঊনবিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ ভাববাদী দার্শনিক হেগেল। হেগেল ইহার বিরুদ্ধে দাঁড় করাইলেন ডায়ালেকটিক বিচাররীতি।
হেগেল নিজেই বলিয়াছেন, ডায়ালেকটিক সম্পর্কে সাধারণের ধারণা ইহা বুঝি যুক্তিতর্কের একটি কৌশল মাত্র। প্রকৃতপক্ষে ডায়ালেকটিক বিশ্বের এবং বিশ্ব ইতিহাসের অন্তর্নিহিত একটি মূলসূত্র। আমাদের চারদিককার যে কোনও বিষয় অথবা ঘটনাই ডায়ালেকটিকের দৃষ্টান্তস্বরূপে কাজ করিতে পারে। গ্রহটি এই মূহূর্তে এই জায়গায়; কিন্তু পরমূহূর্তেই স্থানচ্যুত হইয়া ইহার একটা অবস্থান্তর সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রহিয়াছে। নৈতিক বিষয়ে যায়, আমি হয়তো বা মনে করলাম একটি সৎকাজ করিয়াছি; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমার এই কাজের ফলস্বরূপ জন্মিয়াছে মস্ত একটি অনিষ্ট।
বস্তুবাদীদের চিন্তারীতিকে মেটাফিজিকেল এবং ভাববাদীদের বিচার পদ্ধতিকে ডায়লেকটিকেল আখ্যা দেওয়া হইসে। প্রাথমিক গণিতের (lower mathematics) সহিত উচ্চতম গণিতের (higher mathematics) যে প্রভেদ, উপরোক্ত দুইটি চিন্তারীতির ভিতরেও রহিয়াছে অনুরূপ পার্থক্য। নিম্নতম গণিতের ভিতরে বিষয়গুলি একে অন্য হতে পৃথক। বৃত্ত একটি বৃত্তই; বহুভুজ একটি বহুভুজই; ইহাদের অপর কোনো কিছুতে পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকিতে পারে না। কিন্তু জ্যামিতিকে আমরা দেখিতে পাই যে একটি বহুভুজকে বৃত্তে পরিবর্তিত করা যাইতে পারে। গাণিতিক সংজ্ঞা এবং সূত্রগুলির ভিতর ইহাকে মস্ত একটি বিপ্লব আখ্যা দেওয়া যায়। এই বিপ্লবটিই গণিতের উচ্চতর বিশ্লেষণের শুরু।
ডিফারেনসিয়াল কেলকুলাস্ সম্পর্কে হেগেল বলিয়াছেন, এতো ক্ষুদ্র রাশি লইয়া এই গণিতের কাজ যে মনে হয়, রাশিগুলো বুঝি একেবারেই নিঃশেষিত হইয়া গিয়াছে। নিঃশেষিত হইবার পূর্বেও নয় আবার পরেও নয় এই অবস্থাটিতেই কেলকুলাস তাহার গণনাকার্য করে। হেগেল ঘোষণা করিলেন, এমন কোনো বিষয় নাই, যাহার অবস্থান্তর হয় না, যাহারা নাকি অস্তিত্ব এবং অনস্তিত্বের মধ্যবর্তী কোনো অবস্থা নাই।
ভূবিদ্যার ভিতরে যতদিন ধারণা ছিল যে হঠাৎ একটি বিপর্যয় অথবা প্রলয় অপ্রত্যাশিতভাবে সংগঠিত হইয়া সকল কিছুর চেহারা বদলাইয়া দেয়, ততদিন তাহাতে মেটাফিজিকেল চিন্তারীতিই প্রাধান্য ছিল। কিন্তু যখন বোধ জন্মাইল যে ভূপটল ধীরে ধীরে বিকাশ লাভ করিয়া কোন একটি মুহূর্তে সম্পূর্ণ রূপান্তরিত হয়, তখনই ভূবিদ্যা ডায়ালেকটিক বিচাররীতির আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে। জীববিদ্যা সম্পর্কে ধারণা ছিল, জাতি (species) অপরিবর্তনীয়। ইহা মেটাফিজিকেল ধারণা। ফরাসী বস্তুবাদী দার্শনিকেরা এই ভাবেই ভাবিত। নব্য জীববিদ্যা এই ধারণাটিকে সম্পূর্ণরূপে পরিহার করিয়াছে। ডারউইনের নামে যে বিবর্তনতত্ত্ব প্রচারিত হইয়াছে, তাহা পুরোপুরি ডায়ালেকটিক বিচার প্রসূত।
বিশ্বের সকল ব্যাপারে বিকাশের এই ধারাটি স্বীকৃত হইল বটে, কিন্তু গোল বাঁধিয়া গেল একটি প্রশ্নে, রূপান্তর কি ধীরে ধীরেই হয়, না ধীরে ধীরে অগ্রসর হইয়া একটি বিশেষ অবস্থা পূর্ব হইতে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নতুন একটি জিনিসের সৃষ্টি হয়। যাহারা বৈপ্লবিক পরিবর্তনকে স্বীকার করেন না তাহারা জোর দিলেন ঘটনার সংখ্যাত্মক (quantitive) বিকাশ এবং পরিবর্তনের উপর। একটি বিশেষ মুহূর্তে যে ঘটনার অবস্থান্তর ঘটে তাহার প্রতি ইহারা লক্ষ্য করিলেন না। ইহাদের মতে, nature makes
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments